মহাস্থানগড়ের ২৩০০ বছরের ইতিহা
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার করতোয়া নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রত্ননগরী মহাস্থানগড়। দূর থেকে এটি এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি প্রাচীন দুর্গের মতো মনে হলেও, এর মাটির নিচে লুকিয়ে রয়েছে প্রায় ২৩০০ বছরের ইতিহাস।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মহাস্থানগড়ের প্রাচীন নগরীর নাম ছিল পুন্ড্রনগর বা পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী। নগরটির উত্থান আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে, অর্থাৎ মৌর্য যুগে। তবে নির্দিষ্ট কোন সালে দুর্গটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। বিভিন্ন সময়ে দুর্গের প্রাচীর ও অন্যান্য স্থাপনায় সংস্কার, সংযোজন ও পরিবর্তন হয়েছে।
প্রাচীন এই নগরী ছিল একটি সুরক্ষিত দুর্গনগর। চারপাশে উঁচু প্রাচীর ও পরিখার মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল। নগরীর ভেতরে ছিল বসতি, ধর্মীয় স্থাপনা, প্রশাসনিক কেন্দ্র ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। করতোয়া নদীর তীরে অবস্থানের কারণে বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও নগরটির গুরুত্ব ছিল।
মাটির নিচে পাওয়া ইতিহাস
মহাস্থানগড়ের বিভিন্ন প্রত্নস্থানে খননের মাধ্যমে পাওয়া গেছে প্রাচীন ইটের স্থাপনা, মুদ্রা, মৃৎপাত্র, অলংকার, ভাস্কর্যসহ নানা প্রত্ননিদর্শন। এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, এখানে একসময় সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
মহাস্থানগড়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর একটি হলো মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি। এটি প্রাচীন পুন্ড্রনগরের অস্তিত্ব এবং সে সময়ের প্রশাসনিক ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত।
ইতিহাসের পাশাপাশি লোককথা
মহাস্থানগড় শুধু প্রত্নতত্ত্বের জন্যই বিখ্যাত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য লোকগাথা।
স্থানীয় লোকবিশ্বাসে মহাস্থানগড়ের প্রাচীন রাজা ছিলেন রাজা পরশুরাম। আর ইসলামের প্রচারক হিসেবে এখানে আগমন করেছিলেন শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার। প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, শাহ সুলতান মাছের পিঠে চড়ে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে রাজা পরশুরামের সংঘাত ও যুদ্ধের গল্পও স্থানীয়ভাবে বহুল প্রচলিত।
তবে এসব কাহিনির অনেকটাই লোকবিশ্বাস ও কিংবদন্তি; এগুলোকে সরাসরি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব শুধু এর বয়সে নয়। এটি প্রাচীন বাংলায় নগরসভ্যতা, প্রশাসন, ধর্ম, বাণিজ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাস বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
হাজার হাজার বছর ধরে রাজনৈতিক পরিবর্তন, রাজবংশের উত্থান-পতন এবং সময়ের ক্ষয় পেরিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে এর দুর্গপ্রাচীর।
তাই মহাস্থানগড় শুধু একটি প্রত্নস্থল নয়—এ যেন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জীবন্ত ইতিহাসের বই।
মন্তব্য করুন