ইউক্রেনে যুদ্ধের পেছনের গল্প।

93

ডেস্কঃ যুদ্ধ সব সময় খারাপ। যুদ্ধে প্রাণ যায়, মানুষের, জীব জগতের। কিন্তু যুদ্ধ হয় কেন? রাষ্ট্র আর শাসক শ্রেণীগুলোর স্বার্থের সংঘাতে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার সর্বোচ্চ রূপ। কূটনৈতিক স্তরে সমাধানের অযোগ্য সমস্যাই যুদ্ধের আকার নেয়।

শক্তিশালী রাশিয়া অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইউক্রেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেখে, অনেকের কোমল হৃদয় রক্তাক্ত হচ্ছে। পশ্চিমা মিডিয়া তাদের মত একটা গল্প ছড়িয়ে রেখেছে। যেহেতু তাদের গল্পটাই বাজারে সহজলভ্য তাই কোমল-মতি অনেকে সেটাই বিশ্বাস করে রাশিয়াকে সাংঘাতিক ভাবে দুষতে শুরু করেছেন।

কিন্তু কি এমন হল, যাতে রাশিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল? সমস্ত সমস্যা সৃষ্টির পেছনে একটা ইতিহাস থাকে। খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, রাশিয়া-ইউক্রেনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাস পরস্পরের সাথে জড়িয়ে আছে। রুশ জাতির ইতিহাস শুরু হয় কিন্তু কিয়েভ থেকেই, পরে মস্কো কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। জার আমলে ইউক্রেন শাসিত হত মস্কো থেকে। ইউক্রনীয় এবং রাশিয়ান ভাষা আর লিপিও প্রায় এক রকম। প্রকৃত পক্ষে রুশ ভাষার একটা ডায়লেক্ট হিসাবে ইউক্রেনীয় ভাষা বিকাশ লাভ করে। দুই দেশের পোষাক-আসাক, খাদ্য-পানীয়, শিল্প-সাহিত্য চিরকাল পাশাপাশি থেকেছে। একের মধ্যে অন্যের ছায়া খুঁজে পাওয়া গেছে। এছাড়া রুশ অর্থোডক্স চার্চ উভয় দেশের খ্রীষ্টন ধর্মের ধারক-বাহক। অবশ্য বিগত আট বছরে ইউক্রেনিয়ান অর্থোডক্সির আমদানী করার একটা চেষ্টা চলছে। মাঝে ইউক্রেনের ভূখণ্ড কখনো পোলিশ কখনো অটোমান আবার কখনো জার্মানদের হাতেও পড়েছে। বর্তমান যে ইউক্রেনের মানচিত্র সেটা আকার পায় বলশেভিকদের হাতে। ইউক্রেনের আর্থসামাজিক শ্রীবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বেশ খানিকটা রুশ-ভাষি এলাকা ইউক্রেন সোভিয়েতের সাথে যুক্ত করা হয়, সোভিয়েত আমলে। পুতিন এই সামরিক অভিযান শুরুর আগে যে বলশেভিকদের গাল দিয়েছ, সেটার কারণ ঠিক এটাই। সোভিয়েত আমলে এটা সমস্যা ছিল না। কারণ সমস্ত জাতিগুলোর সমান বিকাশের মাধ্যমে সোভিয়েত আমলে জাতি-সমস্যার নিষ্পত্তি করা হয়েছিল। এর মাঝে ইউক্রেনের ইতিহাসে দুটো ঘটনা ঘটে। ১৭’র বিপ্লবের পর প্রথমদিকে সামরিক ভাবে দুর্বল বলশেভিকরা ব্রেস্ট-লিটোভস্ক চুক্তির ফলে জার্মানির কাছে ইউক্রেনের বেশ কিছুটা অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বলশেভিকরা সে সব পুনরুদ্ধার করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের আক্রমণের মুখে সাময়িক পতন হয় কিয়েভের। সে সময় ইউক্রেনে দুই ধরণের শক্তির প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউক্রেনীয় সোভিয়েতের কমিউনিস্টরা রেড আর্মির অংশ হিসাবে পিতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধে অংশ নেয়। সংখ্যালঘিষ্ঠ একটা অংশ নাৎসিদের সাথে জোট গড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সাবোতাজ করতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের ভেঙে যাওয়ার সময় অবধি। ৯১ এর পরে অন্য সমস্ত ছোট রিপাবলিকগুলোর মত ইউক্রেনেরও যাবতীয় বিদেশী ঋণের দায়িত্ব রাশিয়া গ্রহণ করে মূলত পারমানবিক অস্ত্রসম্ভারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর নিজের আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব অক্ষুন্ন রাখতে। সেই সব ঋণ পরিশোধ হয় ২০১৭তে এসে। ৯১ সালে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসানের পরে রাশিয়া ভেবেছিল ন্যাটোর সাথে বিরোধ মিটে গেল। এমনকি এই ভ্লাদিমির পুতিন স্বয়ং বিল ক্লিন্টনের কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, রাশিয়া ন্যাটোতে যোগ দিলে কেমন হয়? কিন্তু আমেরিকা এমন কাউকে ন্যাটোতে চায়না যারা তাদের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম এবং যাদের মার্কিন স্বার্থের বাইরে স্পষ্ট স্বাধীন বিদেশনীতি আছে। ফলে ন্যাটো পূর্ব ইউরোপে ক্রমাগত এগিয়ে আসতে থাকে রাশিয়ার সীমান্তের দিকে। যেসমস্ত রাষ্ট্রের সুসম্পর্ক ছিল রাশিয়ার সাথে, তারা আক্রান্ত হতে থাকে। যুগোস্লাভিয়া আর চেকশ্লোভাকিয়াকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয় ন্যাটো, হ্যাঁ রাষ্ট্র সংঘের অনুমোদন ছাড়াই। রাশিয়ার কোন ওজর আপত্তি কেউ কান দেয় না। তখন সামরিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল রাশিয়ার পক্ষে কিছু করা সম্ভব ছিল না। রাশিয়া কিছুটা রুখে দাঁড়ায় জর্জিয়া আর চেচনিয়ার ক্ষেত্রে। চেচনিয়ায় ইসলামিক জিহাদিদের অর্থ, অস্ত্র সরবরাহ করেও ন্যাটো কিছু করতে পারে না। জর্জিয়া ন্যাটোতে যুক্ত হয়, কিন্তু তার আগেই রুশ জনগণ অধ্যুষিত সাউথ ওসেটিয়াকে মুক্ত করে রুশ সেনাবাহিনী। ২০১৪ অবধি ইউক্রেনের সাথে খুব বেশি সমস্যা ছিল না রাশিয়ার। ইউক্রেনের জনসংখ্যার ৪০% রুশ ভাষী। ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় বানিজ্যিক পার্টনার ছিল রাশিয়া। ইউক্রেন দিয়েই রাশিয়ান তেল আর গ্যাস যেত ইউরোপকে উষ্ণ রাখতে। চেরনোবিল নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনার দায়িত্ব নিয়ে সেসব সামাল দিতে রাশিয়া বছরে চার বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিত ইউক্রেনকে। ইউক্রেনও রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে ক্রিমিয়া লিজ দিয়ে একটা বড় আয় করত। প্রসঙ্গক্রমে এটা উল্লেখ করা উচিৎ, সোভিয়েত নেতৃত্বই রুশ ভূখণ্ড ক্রিমিয়াকে যুক্ত করেছিল ইউক্রেনের উন্নয়নের স্বার্থে। ২০১৪ সালে, ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ যখন ইউক্রেনের ইলেক্টেড প্রেসিডেন্ট তখন ইউক্রেনের প্রো-ইউ সাপোর্টাররা আন্দোলন শুরু করে। তারা বলছিল ইউক্রেনের শ্রীবৃদ্ধির জন্য তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দিতে চায়। রাশিয়া অভিযোগ করছিল, পশ্চিমারা ইউক্রেনের পরিবেশকে শেষ করে দেওয়ার জন্য ফ্রেকিং করে খনিজ তেল চুরি করতে চায়। এবং রাশিয়া বারবার গোয়েন্দা রিপোর্টে দেখাতে থাকে পশ্চিম ইউরোপের সরকারগুলো এই আন্দোলনকারীদের ইতিমধ্যেই ১০০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য করেছে। আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে এবং একটা পর্যায়ে ইয়ানুকোভিচ পদত্যাগ করে রাশিয়ায় পালিয়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপে বিজয় উৎসব শুরু হয়। আর ইউক্রেনে, পূরানো সোভিয়েত আমলের সমস্ত চিহ্ন স্থাপত্য ভাঙা শুরু হয়। বিবিসি, সিএনএন বারবার করে সম্প্রচার করতে শুরু করে কিভাবে লেনিনের মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া যেটা দেখায়নি, সেটা হচ্ছে, হাজার হাজার রুশ ভাষীদের তাদের ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কমিউনিস্ট পার্টিকে ব্যান করা হচ্ছে, তাদের কর্মীদের খুন করা হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের তাদের মিটিং চলাকালীন জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা যাদের ছবি নিয়ে মিছিল করছিল, আশ্চর্যজনক ভাবে তারা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাতসীদের পরিচিত সহযোগী। রাশিয়া যে বারবার বলছে ডি-নাতসীফিকেশন তাদের ইউক্রেন অভিযানের একটা কারণ, তার উৎস এটাই। পূর্ব ইউক্রেন যেহেতু আসলে সোভিয়েত আমলে সংযোজিত রুশ অঞ্চল, সেকারণে জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রুশ জনগণ । তাদের ওপর আক্রমণ চলতে থাকলে, একটা পর্যায়ে ডোনেতস্ক আর লুগানস্ক (একসাথে দোনোবাস অঞ্চল বলে) অঞ্চলের জনগণ প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। স্বাভাবিক ভাবেই রাশিয়া এই রুশ-ভাষী জনগণকে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতি-বদ্ধ থাকে, সাহায্য করে কিন্তু সেখানের মাটিতে পা না রেখেই। জায়গাটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে। অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে এখানে মিশাইল এর আঘাতে মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস হয়েছিল। এই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্রান্স-জার্মানির মধ্যস্থতায় ইউক্রেন, রাশিয়া মিন্সক অ্যাকর্ড সই করে। ইউক্রেন দাবী করে যে রাশিয়া বিদ্রোহীদের সাহায্য বন্ধ করুক, বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করুক। রাশিয়া বলে, আগে ইউক্রেন এই অঞ্চলে আক্রমণ চালানো বন্ধ করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুক। চুক্তি হয়, কিন্তু উভয় পক্ষই দাবী করতে থাকে অন্য পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছে। ইতিমধ্যে ক্রিমিয়াতে গণভোট হয় এবং ৯৭% ভোট পড়ে রাশিয়ায় যোগ দেওয়ার পক্ষে। পশ্চিম ইউরোপ বলতে থাকে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করেছে। এর ফলশ্রুতিতে তারা বিভিন্ন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা চাপাতে থাকে রাশিয়ার ওপর।

এর পরের ঘটনা বুঝতে ইউক্রেন থেকে একটু অন্য দিকে চোখ ফেরাতে হবে। ২০১০ এর আশপাশ থেকে আরব বসন্ত শুরু হয়। মিশরে হোসনি মুবারককে সরিয়ে মুসলিম ব্রাদারহুড এর জিহাদিরা ক্ষমতায় আসে – পেছনে ন্যাটো। লিবিয়াতেও গাদ্দাফির বিরুদ্ধে জিহাদিদের অর্থ আর অস্ত্র সাহায্য দিতে থাকে ন্যাটো। এরা ঐতিহাসিকভাবেই পশ্চিম বিরোধী ছিল, ফলে রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক ছিল এদের। রাশিয়ার ওজর আপত্তি ন্যাটো কানে তোলে না। ঠিক যেমন তোলেনি ইরাকে সাদ্দামকে উচ্ছেদ আর খুন করার সময়ে।

এবারে পালা আসে সিরিয়ার। ইরাকে বাথিস্ট সাদ্দামকে খুন করার পর ন্যাটোর চোখ যায় বাথিস্ট বাসার আল আসাদের দিকে। এবং এখানেও এক ছক। আল-কায়দা, আইসিস সমেত সমস্ত জিহাদিদের লেলিয়ে দেওয়া হয় আসাদের বিরুদ্ধে। একটু বলে রাখা যাক এখানে, বাথিস্টরা নিজেদের সমাজতান্ত্রিক বলে দাবী করলেও প্রকৃত পক্ষে তাদের আইডিওলজি হচ্ছে আরব-জাতীয়তাবাদ। ওয়াহাবী-জিহাদিদের বাড়বাড়ন্ত কিন্তু এই সাদ্দাম, গাদ্দাফি, হোসনি মুবারক, আসাদ, ইয়াসের আরাফতরাই আটকে রেখেছিল। উল্টো-দিকে জিওনিষ্ট ইজরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল এরাই। ফলে এদের ওপর পশ্চিমের রাগের কারণটা কি খুব সহজে বোঝা যায়। এবং কেন যে এরা রাশিয়ার স্বাভাবিক মিত্র সেটাও।

যুগোস্লাভিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, ইরাক, লিবিয়া, মিশরে রাশিয়াকে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়েছে। মৌখিক আপত্তি আর রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেওয়া ছাড়া কিছু করতে পারেনি রাশিয়া। কিন্তু সিরিয়াতে রাশিয়া আর চুপ থাকতে পারল না। রাশিয়া আর চুপ করে থাকতে পারত না, কারণ : গল্পটা ছিল ইউরোপকে দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা চাপ দিয়ে আসছিল।, রাশিয়ান গ্যাস আর তেল ব্যবহার কমাতে হবে। ইউরোপের আমদানিকৃত জ্বালানীর ৪০% রাশিয়ার। রাশিয়া থেকে কিনলে দাম কম পড়ে, ট্রান্সপোর্টেশনও সুবিধা জনক। ভেনিজুয়েলা আর ইরানের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা। এদিকে কাতার আর সৌদির তেল আসবে কোন রাস্তায়? রাস্তাটা বেরোতে পারে যদি আসাদকে টপকে দেওয়া যায়। ইরাকে আমেরিকার পুতুল সরকার। যদি সিরিয়াতেও পুতুল বসানো যায়, তাহলে সোজা তুরস্ক হয়ে ইউরোপে ঢুকে যেতে পারে জ্বালানীর পাইপ-লাইন। সাথে রাশিয়ার হাতও কেটে ফেলা যাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সিরিয়ার তার্তুস বন্দর থেকে রাশিয়াকে উচ্ছেদ করতে পারলে ভূমধ্য সাগরে রাশিয়ান ফ্লিটকে আটকে দেওয়া যাবে। এক ঢিলে দুই পাখি। সত্যিই আর পুতিনের চুপ করে বসে থাকার উপায় ছিল না। একই সাথে ডনোবাসে ছায়া যুদ্ধ আর সিরিয়ায় সরাসরি জিহাদিদের বিরুদ্ধে নেমে পড়তে হয় রাশিয়াকে। রাশিয়া প্রথমত প্রিসিশন স্ট্রাইক করে আইসিসের অয়েল ট্যাংকারগুলো ধ্বংস করে, যে গুলো সিরিয়া থেকে তেল চুরি করে তুরস্কের সীমান্ত পেরিয়ে ইউরোপে তেল চালান দিত। আর সেই পয়সায় ইউরোপ থেকে অস্ত্র কিনে সিরিয়ায় গণহত্যা চালাত আসাদকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে। ন্যাটো আর আইসিস, দুজনের জন্যেই লাভজনক ব্যবসা। এতে ক্ষেপে গিয়ে তুরস্ক প্রথমেই একটা শুখোই-২৪ ফেলে দেয় ২০১৫’র ২৪শে নভেম্বর। তার ফলশ্রুতিতে কিভাবে এরদোগানকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বুটের তলায় এনে ফেলেছিল রাশিয়া সে গল্প অন্য কোথাও হবে। ইজরায়েলও রাশিয়ার একটা রিকনিসেন্স ইলিউসিন এয়ারক্রাফট ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। নেতানিয়াহুকেও মস্কো ছুটে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসতে হয়, মস্কো নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করে দেওয়ার ভয়ে। কিন্তু রাশিয়া এখানে যতদূর সম্ভব নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েও শেষমেশ আইসিসের কোমর ভেঙে দেয়। এবং এর সাথেই সিরিয়া দিয়ে ইউরোপে তেল পাঠানোর মার্কিন স্বপ্নও ভেস্তে যায়। জার্মানিকে বাল্টিক সাগরের তলা দিয়ে রাশিয়া থেকে আসা নর্ডস্ট্রিম২ পাইপলাইনের অনুমোদন দিতে হয় আমেরিকার আপত্তি সত্ত্বেও।

২০১৪তে যখন ইয়ানুকোভিচকে উৎখাত করা হচ্ছে ইউক্রেন থেকে, পুতিন এক সাক্ষাতকারে বলেছিল, ওয়েস্টার্ন পার্টনাররা যদি এভাবে রিজিম চেঞ্জ করার কথা ভাবতে থাকে, আমাদেরও এবার অন্যরকম ভাবতে হবে। এই সময়ের মধ্যে পশ্চিমে দুটো বড় ঘটনা ঘটে যায়। আর দুটোর পেছনেই পশ্চিমা মিডিয়া রাশিয়ার হাত খুঁজে পায়। আমেরিকায় ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতি হওয়া এবং ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগ, সংক্ষেপে ব্রেক্সিট। ট্রাম্পের “ইউএসএ ফার্স্ট” পলিসি আর ব্রিটেনের সাথে ইইউ এর বিরোধের মাঝে রাশিয়া চুপিসারে কিছু সামরিক আর অর্থনৈতিক হোম-ওয়ার্ক সেরে ফেলে। ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো, গোল্ড রিজার্ভ বাড়ানো, গ্যাস আর তেলের বাজার হিসাবে ইউরোপের বিকল্প হিসাবে চীনের সাথে টাই-আপ করা। এবং ইউরোপ আর আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে “শাপে বর হওয়ায়” পরিণত করা। যেসব পণ্য তারা আমদানি করত, এখন নিজেরাই বানাতে শুরু করে। সামরিক দিক থেকে, মিশাইল ডিফেন্স সিস্টেম এস৪০০, ফিফথ জেনারেশন এয়ারক্রাফট শুখোই ৫৭, হাইপারসনিক জিরকন আর অ্যাভানগার্ড রয়েছে। যেগুলো আটকানোর জন্য মিশাইল ডিফেন্স সিস্টেম দুনিয়ায় কারো নেই। সাথে রাশিয়া আন-ম্যানড সিকস্থ জেনারেশন এয়ারক্রাফট বানানোর কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে, আর সেটা কোন সাধারণ ড্রোন যে নয় সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিতে যেভাবে এ.আই. টেকনোলজিকে রাশিয়া ব্যবহার করেছে, বাকিদের সেসব ছুঁতে সময় লাগবে। সাথে মজুত আছে ছ’হাজারের ওপর নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড। ফলে মিলিটারীলি রাশিয়াকে কাঠি করার আগে ন্যাটোকে বহুবার ভাবতে হবে।

গতবছর আমেরিকা আফগানিস্তান ছাড়ল ২০ বছর বাদে। তালিবানদের নিয়ে রাশিয়ার মাথাব্যথা থাকলেও কেন যে রাশিয়া এটা স্বাগত জানালো সেটা বুঝতে পারা খুব কঠিন না। দক্ষিণ দিক থেকে যেন ন্যাটোকে না মোকাবিলা করতে হয় সেটা নিশ্চিত হল রাশিয়ার কাছে। ১৯৮৭তে বুশ আর গর্ভাচভের মধ্যে সাক্ষরিত ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ মিশাইল ট্রিটি থেকে কিন্তু ২০১৯ সালে বেরিয়ে যায় আমেরিকা। ৫০০ -৫৫০০ কিমি রেঞ্জের ব্যালেস্টিক মিশাইল যদি ইউরোপে বসে, সেটা যে পক্ষই বসাক, লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন, মস্কো সবাই কিন্তু তার সীমানার মধ্যে থাকে। রাশিয়া বারবার এই চুক্তি পুনঃ-সম্পাদিত করার কথা বলতে থাকে। ইউরোপকে কোল্ড-ওয়ার আর ন্যাটো মেন্টালিটির বাইরে এসে ইউরোপিয়ান সিকিউরিটি নিয়ে ভাবতে বলে। ততদিনে বাইডেন এসে গেছে। ন্যাটোর ইস্টার্ন ফ্ল্যাঙ্ক রুশ সীমান্তের ধারে কাছে মহড়া দিতে থাকে। ইতিমধ্যে বেলারুশেও লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে একটা রিজিম চেঞ্জ এর জন্য ক্যু এর পশ্চিমা চেষ্টা ব্যর্থ হয়। জোর আলাপ আলোচনা চলতে থাকে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেবে কিনা। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন, পশ্চিমারা ইউক্রেনকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে চুপ থাকে। অথচ ২০১৪ তে যে মুভমেন্টে ইয়ানুকোভিচ উচ্ছেদ হয়, তার প্রধান দাবী ছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দেওয়া। সেটা ছিল অর্থনৈতিক দাবী, আর সেটা বাদ দিয়ে পশ্চিমারা ন্যাটোয় যোগদানের সামরিক বিষয়টাকেই প্রধান করে তুলল।
আর রাশিয়ার বসে থাকার সময় ছিল না। রাশিয়ানরা পরিষ্কার জানালো তাদের আপত্তি আছে। ইউক্রেন যদি ন্যাটোয় যোগ দিয়ে ক্রিমিয়া পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে, সেখানে ন্যাটো বনাম রাশিয়া মুখোমুখি হবে, ন্যাটোর সংবিধানের ফিফথ আর্টিকেল অনুযায়ী। পশ্চিম বরাবরের মত বলে গেল, যে যার সাথে খুশি যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা রাখে। আন্তর্জাতিক যেকোনো আইনেরই একটা প্রেক্ষিত থাকে। আপনি যদি প্রেক্ষিত বিহীন ভাবে যেকোনো আইনকে বিচার করেন, যেকোনো আপাত ভালো দেখতে লাগে এমন আইন দিয়ে চূড়ান্ত অবিচার করা সম্ভব। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থায় প্রথম থেকেই সেটা হয়ে চলেছে, দুনিয়া জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ শেষ না হওয়া অবধি সেটাই চলতে থাকবে।

রাশিয়া ইউক্রেনে ঢুকে গেছে, মিলিটারি অপারেশন চালাচ্ছে। পশ্চিম তাদের মত করে চেল্লাচ্ছে। না বুঝেও অনেকে চেল্লাচ্ছে। যুদ্ধ খুব খারাপ জিনিষ। শেষ বিচারে তাতে গরীব মানুষ মারা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাশিয়াও কোন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ইউক্রেনে ঢোকেনি। তারা সেখানে গেছে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষিত করতে। কিন্তু যেকোনো যুদ্ধেই ন্যায়-অন্যায়ের এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকে ভাবলে, আপনি আপাত দৃষ্টিতে যা দেখতে পাচ্ছেন, সেটা বিষয়-বস্তুর অন্তর্নিহিত কারণ নাও হতে পারে। গোটা বিশ্ব-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাটা ১৯৯১ সালে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের পরে এক-মেরুতে পরিণত হয়। বিশ্বের যেকোন প্রান্তে জনগণের যেকোনো লড়াই আন্দোলন থেকে বিপ্লবী আন্দোলন মার্কিনীরা প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে কিভাবে দমন করেছে তার ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন। নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তা, পেরুর সাইনিং পাথ, ফিলিপিন্স, কলোম্বিয়া, কুর্দিস্তান, গোটা এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে বিগত ৩০-৪০ বছর ধরে প্রতিটা বিপ্লবী আন্দোলন থেকে সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দমন করতে পেরেছে শুধুমাত্র এই এক-মেরু বিশ্ব-ব্যবস্থার জন্য। তাদের চ্যালেঞ্জ করার মত কেউ নেই। তাদের নিজেদের ভূখণ্ডের বাইরের থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে ভাবতে হয়নি বলেই তারা গোটা বিশ্বের গরীব জনগণের ওপর মাস্তানি করে বেড়াতে পেরেছে, নিজেদের দেশেও প্রতিবাদী জনগণকে দমন করে রাখতে পেরেছে।

ইউক্রেনে ফেরা যাক। অনেকে ভাবছে বিশ্বযুদ্ধ লেগে গেল। সম্ভবত না। ন্যাটো ঢিল মেরে জল মাপল ইউক্রেনকে দিয়ে। রাশিয়া জানান দিলো তার বহুদিন ধরে বলে আসা রেড লাইন কোনটা। ইউক্রেনকে এই সর্বনাশের দোরগোড়ায় ঠেলে দিল ন্যাটো এবং ইউক্রেনে ক্ষমতাসীন নিও-নাৎসিরা। ব্যবসা-উৎপাদন সব ঘেঁটে গেছে, আরও যাবে। ইউক্রেনের চার কোটি মানুষের ভরন-পোষণের দায়িত্বও কি তাহলে আমেরিকা-ইউরোপ নিচ্ছে? এখনই কিন্তু ইউক্রেনের জেলেন্সকি সরকারের প্রচুর অভিমান আর অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে। আর ন্যাটো যে ইউক্রেনে পা দেবে না, সেটাও জেনারেল সেক্রেটারি স্টলটেনবার্গ বলে দিয়েছে। বাইডেনও বলে দিয়েছে রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে গুলিবিনিময় মানে বিশ্বযুদ্ধ। নিউক্লিয়ার আর্মাগডন কেউ চায় না। জেলেন্সকি আজ স্পষ্টভাবে বলেছে যে ইউরোপের ২৭টা দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে সে সাহায্য চেয়েছিল, কারো সাহস হয়নি। ইউক্রেন একা। আমেরিকার সঙ্গীদের এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। তালিবানদের হাতে আশরফ গনিকে গতবছরেই ছেড়ে গেছিল মার্কিনীরা।

ইউরোপেও অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে খারাপ প্রভাব পড়বে । জ্বালানীর জন্য ভর্তুকি না দিতে পারলে সোশ্যাল আনরেস্ট এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর বিবাদ বাড়বে। অভিবাসন প্রত্যাশীদের পেছনে খরচ কমতে বাধ্য হবে, তাদের দায়ভার নিয়ে আবার ঝামেলা চলবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের দেশগুলোর মধ্যে। বাইডেন এবং জনসন দুজনেই স্বীকার করেছে ‘স্বাধীনতার আর্থিক দায়ভার’ আছে, এবং সেটা অবশ্যই সেদেশের সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপবে। ট্রাম্পের আমলে ন্যাটোর আর্থিক দায়ভার নিয়ে ইউরোপের সাথে আমেরিকা বারবার বিবাদে জড়িয়েছে, ইউরোপ প্রোপরশানাল খরচ করছে না বলে। আর যখন তেল, গ্যাসের পেছনে খরচ বাড়াতে বাধ্য হবে ইউরোপ, তারা সামরিক খাতে অতিরিক্ত খরচ বাড়িয়ে দিতে পারবে কি? ক্রমাগত আনরেস্ট বাড়বে ইউরোপে। হয় লেফটিস্টরা এর নেতৃত্ব দেবে। নাহয় আশঙ্কাজনক ভাবে ফার-রাইটিস্ট, নিও-নাৎসিরা এগিয়ে আসবে। গত দশকে ইউরোপ জুড়ে ফার-রাইটিস্টদের উত্থান ছিল চোখে পড়ার মত। প্রচণ্ড হতাশাজনক হলেও এটা সত্যি যে, এই পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসতে পারার মত কমিউনিস্ট পার্টির অস্তিত্ব দুনিয়ায় কোথাও চোখে পড়ছে না। না হলে, এই পরিস্থিতি বিপ্লবী পরিস্থিতি হিসাবে পেকে উঠতে বেশি সময় লাগার কথা না। উপায় নেই এখানে লেনিনকে স্মরন করা ছাড়া। বিপ্লবের জন্য দুটো বিষয় লাগে। অবজেক্টিভ কন্ডিশন আর সাবজেক্টিভ প্রিপারেশন। অবজেক্টিভ কন্ডিশন সাম্রাজ্যবাদের এই যুগে দাঁড়িয়ে বারবার পেকে উঠলেও এই পূরানো সমাজের গর্ভ থেকে নতুন সমাজ জন্ম নিতে পারছে না, কেবলমাত্র সব্জেক্টিভ প্রিপারেশনের অভাবে। নিখুঁত রাজনীতি এবং দৃঢ় সংগঠনের পার্টি, গন-ফৌজ আর যুক্তফ্রন্ট থাকলে এই পরিস্থিতির মধ্যে থেকে নতুন সমাজের জন্ম দিতে পারত, সাম্রাজ্যবাদের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিতে পারত।

আপাতত যুদ্ধের ময়দানে ফেরা যাক। রাশিয়া যে তিনটে জিনিস চেয়েছিল, ১) ন্যাটোর পূর্বদিকে (রাশিয়ার দোরগোড়ায়) সম্প্রসারণ বন্ধ করা। ২) মিন্সক অ্যাকর্ড মান্য করা, দোনোবাস এলাকায় আগে ইলেকশন করানো। ৩) ইউক্রেন কখনো ন্যাটোয় যোগ দেবেনা নিশ্চিত করা। ম্যাক্রন, ওলাফ সলজ, বাইডেন, জনসন কেউই শুনতে চায়নি। সেগুলো বাদ দিয়ে রাশিয়ার দিক থেকে কথা বলার কোন অর্থ থাকে না। ফলে যা ঘটার সেটাই ঘটেছে। এখন রাশিয়ার পেছনে ফেরার প্রয়োজন খুব কম। ইউক্রেনে বেশিদিন সেনাবাহিনী রাখার চেয়ে প্রো-রুশ একটা পুতুল-সরকার বসিয়ে দিয়ে, রাশিয়ার স্বার্থানুকূল কিছু চুক্তি পাশ করে নেওয়াই পুতিনের জন্য সুবিধাজনক। পশ্চিমের হাতে কয়েকটা রাস্তাই খোলা। ১) সরাসরি যুদ্ধ। সেটা তারা করতে সাহস করবে না। ২) রাশিয়ার দাবী মেনে নেওয়া। সেটাও তারা করবে না। ৩) ইউক্রেন এবং রাশিয়ার প্রভাবাধীন এলাকায় প্রক্সি ওয়ার চালানো। ব্রিটেন, আমেরিকার হুমকি ৩ নম্বরের দিকেই। ফ্রান্স, জার্মানি আর অন্যরা কতদিন এটা টানতে পারে তার ওপর নির্ভর করছে কতদিন এই পরিস্থিতি জারি থাকবে।

(শান্তনু ভট্টাচার্যের ওয়াল থেকে সংগ্রহীত)