ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা নিয়ে হতাশা প্রধানমন্ত্রীর

158

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষা চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে যারা এ দেশে জন্মেও ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলে তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, দেশের মাটিতে থেকে যারা বাংলা ভাষা ভুলে গিয়ে বাংলা ভাষার মতো বাংলা বলতে পারে না, ইংরেজি অ্যাকসেন্টে কথা বলে, তাদের প্রতি করুণা করা ছাড়া আর কিছুই বলার নেই।

শুক্রবার বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক ছেলে-মেয়ে বাংলা ভাষায় কথা বা নিজের এলাকার কথা বলাটা (আঞ্চলিক ভাষা) ভুলে গিয়ে কেমন যেন ইংরেজি অ্যাকসেন্টে বাংলা বলার চেষ্টা করে। মনে হচ্ছে বাংলা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। যারা এই দেশেই লেখাপড়া শিখেছে।’

তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের পর দেশে আসতে না পারায় আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিদেশে থেকে বিদেশের স্কুলে পড়তে হলেও দুই বোন (শেখ হাসিনা ও রেহানা) সবসময়ই ছেলে-মেয়েদের বাংলা শেখাবার চেষ্টা করেছি এবং ঘরে বাংলায় কথা বলেছি। কারণ বাংলা ভাষাটা শিখতে হবে।’

নিজেও ভালোভাবে কথা বলার ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ এবং ঢাকার ভাষা মিলিয়েই কথা বলে থাকেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেহেতু ছোটবেলায় ঢাকায় চলে এসেছি সেই ভাষার একটা প্রভাব, আর টুঙ্গিপাড়ায় জন্মেছি তার একটা প্রভাব- সব মিলিয়েই বলি, যার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই।’

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা সেই ভাষণে গোপালগঞ্জের শব্দ বলে গেছেন অকাতরে, যা মানুষের ভেতর একটা আবেদন সৃষ্টি করেছিল। জাতির পিতা দ্রুত মানুষের হৃদয়ে, মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। মানুষের কথা বলতে পেরেছিলেন। সেটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের মানুষ সেটা কিন্তু গ্রহণ করেছে।’

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং হেড অব দ্য অফিস এন্ড ইউনেস্কো রিপ্রেজেন্টেটিভ মিজ বিয়ট্রিজ কালডুন বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. পবিত্র সরকার অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন স্বাগত বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের মাধ্যমে বিশ্বের সব মাতৃভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করায় বিভিন্ন দেশের কোমলমতি শিশুরা নিজস্ব মাতৃভাষায় অনুভূতি ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার প্রশিক্ষণের জন্য ট্রাস্ট ফান্ড গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি চাই এর ইন্টারেস্টের টাকা থেকে ভাষা শিক্ষার জন্য ফেলোশিপ চালু করা হবে। কোন কোন ভাষা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে শেখানে হবে ইন্সটিটিউট সেই সিদ্ধান্ত নেবে। যারা শিখবে তারা টাকা দিয়ে পড়বে। পাশাপাশি ফেলোশিপ থেকেও কিছু টাকা দেয়া হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব এখন বৈশ্বিক গ্রাম। এখানে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসা করা, অন্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি জানতে অন্য ভাষা শেখার প্রয়োজন আছে। কিন্তু মাতৃভাষাকে অবহেলা করে নয়। একুশে ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছর মেয়াদের শেষ দিকে তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা এই ইন্সটিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও ২০০১ সালের সরকার পরিবর্তনে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে ইন্সটিটিউটের অবশিষ্ট কাজ শেষ করা হয়।

সে প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ সালে যারা ক্ষমতায় এসেছিল (বিএনপি) তারা এই ইন্সটিটিউটের কাজে আর গুরুত্ব দেয়নি। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে আমি আবার কাজ শুরু করেছি।’ ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মাতৃভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ঢাকার রাজপথ সালাম, বরকত, জব্বারসহ শহীদদের বুকের রক্তে রঞ্জিত করা এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং বারবার কারা নির্যাতন ভোগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এটা হল বাস্তবতা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুই বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। ১৯৫২ সালে পিকিং শান্তি সম্মেলনে যাওয়ার পর জাতির পিতা সেখানে বাংলা ভাষাতে বক্তব্য রাখেন। একইভাবে জাতিসংঘেও তিনি বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন।’

জাতির পিতার পদাংক অনুসরণ করে তিনি নিজেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রতিবছর বাংলায় ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি অর্জনে কানাডা প্রবাসী বাঙালি রফিক ও সালামের অবদানের কথাও স্মরণ করেন।

সরকার জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও তথ্য-প্রযুক্তিতে ব্যাপকভাবে বাংলা ভাষার প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মোবাইল সেটে বাংলা কী-প্যাডের ব্যবহার চালু, ‘ডট বাংলা’ ডোমেইন এবং ৯টি ভাষা শিক্ষার জন্য অ্যাপ চালু করা হয়েছে।’

শেখ হাসিনা একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীকে ঘিরে বছরব্যাপী ‘মুজিববষর্’ উদযাপনকালে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা, অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন এবং প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিদেশি কূটনীতিক এবং মিশন প্রধানসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, একুশে পদক বিজয়ী, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সমবেত কণ্ঠে সকলের অংশগ্রহণে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপরই অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি বাজানো হয়। শহীদদের স্মরণে সকলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে পৌঁছে এর সম্মুখ দেয়ালে জাতির পিতার একটি ম্যুরাল উন্মোচন করেন। প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইমেন্ট অফিসার আরিফুজ্জামান নূরুন্নবী যার ভাস্কর।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালায় (ইন্টারন্যাশনাল ফোনেটিক অ্যালফাবেট-আইপিএ) লিপান্তর এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ভাষণ ইশারা ভাষায় ও ব্রেইল লিখন-বিধিতে প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করেন।

অনুষ্ঠানের শেষে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট ভবনে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির কার্যালয় পরিদর্শন করেন।